বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:০৫ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) ও ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৮৪ জনকে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া দুটি প্রতিষ্ঠানের ৬টি বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হয়ে রাতভর দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সোমবার রাতে নগরীর ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনুভা চৌধুরী জোয়ার পরিবারের বিরোধীয় পক্ষ বাড়ি দখল করতে হুমকি ও দুই নারীকে হেনস্থা করে। এসময় তাদের সঙ্গে ছিলেন বিএম কলেজের সমন্বয়ক মোস্তাফিজুর রহমান রাফি। একপর্যায়ে ববির শিক্ষার্থীরা ও জোয়ার সহপাঠীরা ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে রাফিকে মারধর করে। মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে মারধর করে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনটি বাসে চড়ে ববি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে নগরীর বটতলা এলাকার দিকে রওনা দেন। এর মধ্যে একটি বাস বটতলা এলাকায় পৌঁছলে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা বাসটিতে হামলা করে ভাঙচুর চালায়। এসময় ২৫ জন ববি শিক্ষার্থী আহত হন। বাকি দুইটি বাস আসার পথে ধারাল অস্ত্র-লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালায় বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র বলছে, ‘মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে নগরীর বটতলা এলাকায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে আটকে চাঁদাবাজ দাবি করে বেধম মারধর করা হয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুটি বাস ভরে ঘটনাস্থলে আসেন। সেখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগে থেকে ওত পেতে থাকা বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাস ভাঙচুর করে। এ সময় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়তে চাইলে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে বটতলা, মুন্সি গ্যারেজ ও বিএম কলেজের সম্মুখ সড়ক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।’
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী চার্লস শোভন বাড়ৈ জানান, তাদের দুই শিক্ষার্থীকে বটতলা এলাকায় আটকে রাখার খবর পেয়ে তারা দুটি বাসযোগে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা ইট নিক্ষেপ করে গাড়ি ভাঙচুর চালায়। এরপর লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলায় তাদের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। প্রতিরোধ গড়তে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে।
শোভন জানান, সংঘর্ষ চলাকালে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে। এরপর তাদের ছাড়িয়ে আনতে শিক্ষকদের শরণাপন্ন হন। পরে উভয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা একত্রিত হয়ে ওই শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে আনেন এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে বিষয়টি সমাধানের লিখিত প্রতিশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা স্বাক্ষর করেন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডীন ড. মোহাম্মদ শফিঊল আলম বলেন, ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি বিএম কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে আমাদের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। আহতদের মঙ্গলবার রাতেই শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার সমাধানের ব্যাপারে উভয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানগণ লিখিত আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। শিক্ষার্থীরা সুস্থ হওয়ার পর তাদের কাছ থেকে বিষয়টি ভালোভাবে জেনে এরপর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সরকারি বিএম কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. আমিনুল হক বলেন, ‘দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আটকে পড়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থীকে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের হাতে সুস্থ অবস্থায় তুলে দেওয়া হয়।’ একই সঙ্গে তিনি গাড়ি ভাঙচুরসহ বিএম কলেজের আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয়ভার বহনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। শিক্ষার্থীরা সুস্থ হওয়ার পর তাদের নিয়ে একটি বৈঠক করে সকল বিষয়ে সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি।
কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঙ্গলবার রাতে বিএম কলেজ সমন্বয়ক মোস্তাফিজুর রহমান রাফিকে মারধর করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে রাত ১১টার দিকে বটতলা এলাকায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে মারধর করে বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হামলা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে, মঙ্গলবার রাতের ঘটনায় আহতরা বরিশাল শের ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আহতদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. এস এম মনিরুজ্জামান। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ নজরুল হোসেন।

বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা সাত দফা দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে বলেন, একজন গরিব বাসচালকের কাছে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ৬০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয় এবং তাকে জিম্মি করে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে আরও ২০ হাজার টাকা আদায়কালে দুজন চাঁদাবাজ বটতলা এলাকায় এলাকাবাসীর হাতে আটক হন। এলাকাবাসীর অনুরোধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হয়ে চাঁদাবাজদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে ঘটনাক্রমে জানা যায়, চাঁদাবাজ দুজন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি বিবেচনা না করে এবং দুজন চাঁদাবাজের পক্ষ নিয়ে রাত ১২টায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসযোগে একদল শিক্ষার্থী এসে বটতলায় সাধারণ শিক্ষার্থী এবং পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালায়। তখন বরিশালের সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানমাল রক্ষার্থে জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেস স্টাডি না করেই নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চাঁদাবাজ শিক্ষার্থী দুজনের পক্ষে দেশীয় অস্ত্র এবং ট্রাকভর্তি ইট-পাথর নিয়ে বিএম কলেজে হামলা চালায়। এই হামলায় বিএম কলেজের শিক্ষার্থী এবং সহযোগিতায় এগিয়ে আসা অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীরা গুরুতর আহত হন। এসময় সন্ত্রাসীরা বিএম কলেজের পরিবহণ পুলের সব বাস, ড্রাইভারদের রুম, মুসলিম হল, হিন্দু হল এবং মহাত্মা অশ্বীনি কুমার ছাত্রাবাসসহ বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে ভাঙচুর করে।
বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা বলেন, রাত ১টায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কীভাবে বাস নিয়ে অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রওনা হওয়ার অনুমতি দেয়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা এর জবাব চাই। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল তথা দক্ষিণবঙ্গের জ্ঞানের বাতিঘর শতবর্ষী বিএম কলেজের বনমালী গাঙ্গুলি ছাত্রী হোস্টেলে হামলা করেছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার নয় ৷ এসময় আশপাশে বিএম কলেজের শিক্ষকদের বাসায়, সাধারণ মানুষদের বাসাবাড়ি এবং দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাট করা হয়। এতে করে আতঙ্ক বিরাজ করে কলেজ এলাকায় থাকা সর্বসাধারণের মাঝেও। সংঘর্ষে আহত শিক্ষার্থীরা শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গেলে সেখানেও তারা সড়কে বাধা দেন। সংঘর্ষের সময় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ হামলাকারীকে আটক করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের সবাইকে আমরা নিজেরা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রশাসনিকভাবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী হাতে হস্তান্তর করি।
এসব অভিযোগ এনে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা ৭ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হল- বাস নিয়ে আসা হামলাকারী, বটতলায় চাঁদাবাজকারী, এর পেছনে মদতদাতা এবং উসকানি প্রদান করা সবার সুষ্ঠু বিচার করা; মধ্যরাতে বিএম কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলার ফলে যেসব শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন তাদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার ব্যয়ভার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে গ্রহণ করা; বিএম কলেজসহ সকল সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীকে কোনোরূপ হয়রানি না করা; বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল শহরে কোনো ধরনের অরাজকতা যাতে সৃষ্টি করতে না পারে সেই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা; কলেজ, সব হোস্টেল এবং সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি, দোকানপাট ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনার সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেয়া; হামলায় জড়িত সব সন্ত্রাসীকে অতিদ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে আর কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীর ওপর হামলা হলে এর দায়ভার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কেই নিতে হবে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থী এক গরিব বাসচালককে জিম্মি করে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অভিযোগ করে বিএম কলেজ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দুজন চাঁদাবাজের পক্ষ নিয়ে রাত ১২টায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসযোগে একদল শিক্ষার্থী এসে বটতলায় সাধারণ শিক্ষার্থী এবং পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালায়। পাল্টা অভিযোগে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) নগরীর ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর পরিবারের বিরোধীয় সম্পত্তি দখলের চেষ্টায় হুমকি এবং তাদের এক সহপাঠী ও তার মাকে হেনস্তা করেন বিএম কলেজের সমন্বয়ক মোস্তাফিজুর রহমান রাফি। খবর পেয়ে ববি শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে হাজির হলে রাফিসহ তার সহযোগীদের হামলার শিকার হয়। এরপর মঙ্গলবার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে দুই সহপাঠীকে মারধর করে বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, এ খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনটি বাসে চড়ে ববি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে নগরের বটতলা এলাকার দিকে রওনা দেন। একটি বাস নগরীর বটতলা এলাকায় পৌঁছানোর পথে শিক্ষার্থীবোঝাই বাসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। তখন ববি শিক্ষার্থীরা বিএম কলেজ অভিমুখে গেলে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং বহু শিক্ষার্থীকে আহত করা হয়।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply